সোমবার, ৭ জানুয়ারি, ২০১৩

মক্কার মুশরিকরা কেমন ছিল?

Posted: 06 Jan 2013 10:18 PM PST
মক্কার মুশরিকদের যদি জিজ্ঞাসা করা হত, বলতো, তোমাদের কে সৃষ্টি করেছেন? এই আকাশ-জমিন কে সৃষ্টি করেছেন? আশ্রয় দেয়ার মালিক কে? কার হাতে সকল কিছুর কর্তৃত্ব? এই প্রশ্নগুলোর জবাবে তারা বলতো, আল্লাহ।


আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ বল,‘তোমরা যদি জান তবে বল, ‘এ যমীন ও এতে যারা আছে তারা কার?’ অচিরেই তারা বলবে, ‘আল্লাহর । বল,‘তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?’ বল, ‘কে সাত আসমানের রব এবং মহা আরশের রব’? তারা বলবে,‘আল্লাহ।’ বল, ‘তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না?’ বল, ‘তিনি কে যার হাতে সকল কিছুর কর্তৃত্ব, যিনি আশ্রয় দান করেন এবং যাঁর ওপর কোন আশ্রয়দাতা নেই?’ যদি তোমরা জান। তারা বলবে, ‘আল্লাহ।’ বল, ‘তবুও কীভাবে তোমরা মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছ?’ [সূরা মুমিনূনঃ ৮৪-৮৯]
আল্লাহ তা’আলা আরো বলেনঃ আর তুমি যদি জিজ্ঞাসা কর,আসমানসমূহ ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞই কেবল এগুলো সৃষ্টি করেছেন। [সূরা যুখরফঃ ৯]
আল্লাহ তা’আলা আরো বলেনঃ অর্থঃ আর তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ।’ তবু তারা কীভাবে বিমুখ হয়? [সূরা যুখরফঃ ৮৭]
অর্থাৎ আয়াতগুলোর অর্থ পর্যালোচনা করলে আমরা পাইঃ সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, আশ্রয়দাতা, সকল কিছুর একমাত্র কর্তৃত্ব হিসেবে আল্লাহ তা’আলাকে মেনে নেয়ার পরও এই মুশরিকরা কিন্তু মুসলিম হতে পারে নি! বিষয়টি ভেবে দেখার দাবী রাখে।

নিম্নে কিছু পয়েন্ট আলোচনা করা হল যে কারণে মুশরিকগণ মুসলিম হতে পারেন নি।
১. আল্লাহ তা’আলার রবুবিয়াতের স্বীকৃতি প্রদান কিন্তু উলুহিয়াতে অস্বীকৃতি করাঃ
সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, আশ্রয়দাতা, সকল কিছুর একমাত্র কর্তৃত্বশীল - এই বিষয়গুলো তাওহীদুর রবুবিয়াতের সাথে সম্পৃক্ত। মক্কার মুশরিকরা তাওহীদুল উলুহিয়া তথা সকল প্রকার ইবাদত শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যে এই বিষয়টিতে অস্বীকার করে তারা নানা রকম রসম-রেওয়াজের মাধ্যমে তাদের ইবাদতগুলো সম্পাদন করতো। তারা যুক্তি প্রদর্শন করতো এই নানা রকম রসম-রেওয়াজ, মূর্তিপূজাতাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য করে দিবে অথচ এই বিষয়ে আল্লাহ তা’আলা কোন দলীল নাযিল করেন নি। যার ফলশ্রুতিতে মক্কার মুশরিকগণ মুসলিম হতে পারেনি।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেঃ “জেনে রেখ,আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ ইবাদাত-আনুগত্য। আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা কেবল এজন্যই তাদের ‘ইবাদাত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।”[সূরা যুমারঃ ৩]
আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন,আল্লাহর নিকট দোয়া চাইতে সুন্নাহ বহির্ভূত মাধ্যম গ্রহণ যেমনঃ মূর্তির ইবাদত করা ছিল মক্কার মুশরিকদে রীতি। আর এর আধুনিক ভার্সন হচ্ছে মৃত ব্যক্তির নিকট দোয়া করা, মাজারে যেয়ে দান করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের মাধ্যম গ্রহণ করা, পীর তথা বিভিন্ন দরবার এর তরীকা গ্রহণ করা। বিভিন্ন মতবাদ এর অনুসরণ করা।।
২. আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নাযিলকৃত উপদেশ গ্রহণ করতে অস্বীকার করাঃ
মানব জাতিকে একত্ববাদের পথে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্যে আল্লাহ তা’আলা যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। আর শেষ নবী ও রাসূল হচ্ছেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা ‘যিকর’ বা ‘উপদেশ’ তথা কুরআন এবং সুন্নাহ(কর্মনীতি,কর্মপদ্ধতী) নাযিল করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদের নাযিলকৃত ‘যিকর’ তথা ‘উপদেশ’ অনুযায়ী ইবাদত সম্পাদন করার জন্যে আহবান জানালেন তখন তারা তা অস্বীকার করেছিল। বরং নিজেদের বাপ-দাদা তথা পূর্বপুরুষদের নিকট থেকে যে পদ্ধতী তারা হাতে পেয়েছে তাই নিয়ে তারা সন্তুষ্ট ছিল, উপদেশ গ্রহণ করতে সম্মত হয়নি। নিজস্ব যুক্তি-পদ্ধতী ও ঐতিহ্য অনুযায়ী ইবাদত করা তাদের কে মুসলিম বানাতে পারে নি যদিও তারা আল্লাহ তা’আলাকে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, আশ্রয়দাতা, সকল কিছুর একমাত্র কর্তৃত্বশীল হিসেবে মেনে নিয়েছিল। কারণ, আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নাযিল কর্তৃক ‘যিকর’ বা ‘উপদেশ’ বিনা শর্তে মেনে নেয়া এবং তা মানার ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শর্তহীন আনুগত্য করা হচ্ছে একজন মুসলিমের দায়িত্ব।
ইরশাদ হচ্ছেঃ “বল, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে(সত্যিই) ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর(অর্থাৎ, ইসলামের একত্ববাদ গ্রহণ কর,কুরআন এবং সুন্নাহ’র অনুসরণর কর), আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।” [সূরা ইমরানঃ ৩১]
৩. তাকওয়া অবলম্বন না করাঃ
মানুষ যখন ইসলামের একত্ববাদ মেনে নিবে,কুরআন ও সুন্নাহ’র অনুসরণ করবে তখন তার মাঝে তাকওয়ার গুণাবলী পরিস্ফুটিত হবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সে তাগুত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে কুরআন ও সুন্নাহ’র অনুসরণ করবে। সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করবে। মুসলিম হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্তই হচ্ছে তাগুতকে অস্বীকার করা আর সংক্ষিপ্ত আকারে তাগুত হচ্ছে তাই যা শয়তানের পথ, যা ‘যিকর’ বা ‘উপদেশ’ এর বিপরীত। একজন তাকওয়া অবলম্বনকারী শুধু নিজেই বাঁচবে না বরং সেই সাথে তার পরিবার, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদেরকেও তাকওয়া অবলম্বনকারী হওয়ার আহবান জানাবে। মক্কার মুশরিকগণ আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করে তাদের কর্ম সম্পাদন করে নি, আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নাযিল কৃত কুরআন-সুন্নাহ মেনে নেয়নি,অনুসরণ করে নি যার ফলশ্রুতিতেতারা মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেনি।
৪. সত্য সামনে প্রকাশিত হওয়ার পরও তা অস্বীকার করাঃ
আল্লাহ তা’আলাকে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, আশ্রয়দাতা, সকল কিছুর একমাত্র কর্তৃত্বশীল হিসেবে মেনে নেয়া। এরপর যখন সামনে আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নাযিলকৃত ‘যিকর’ বা ‘উপদেশ’ তথা কুরআন-সুন্নাহ সামনে দলীল এবং উপযুক্ত প্রমাণ সহকারে উপস্থিত হয় আর সেই সাথে সে এটাও বুঝতে পারে যে এ ‘যিকর’ বা ‘উপদেশ’ তথা কুরআন-সুন্নাহ(কর্মনীতি, কর্মপদ্ধতী) আল্লাহর নিকট থেকে এসেছেকিন্তু তবুও তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করা। নাযিলকৃত ‘যিকর’ গ্রহণ করতে এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালিত করতে গড়িমসি করা,মোহাচ্ছন্ন ভাব প্রদর্শন করা, ‘যিকর’ এর বিপরীত কর্মনীতি-কর্মপদ্ধতী অনুসরণ করা মক্কার মুশরিকদের কর্মনীতি। যার কারণে মক্কার মুশরিকগণ মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি।
আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “তার চাইতে বড় যালেম আর কে হতে পারে যে ব্যক্তিকে তার মালিকের আয়াতসমূহ দ্বারা নসীহত করা হয়, অতপর সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, অবশ্যই আমি নাফরমানদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিবো” [সূরা আস-সাজদাঃ২২]
সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, আশ্রয়দাতা, সকল কিছুর একমাত্র কর্তৃত্বশীল হিসেবে আল্লাহ তা’আলাকে মেনে নেয়ার পরও তা মক্কার মুশরিকদের মুসলিম বানাতে পারেনি তাই আমাদের মুসলমান ভাইদের ভেবে দেখার আহবান জানাই এবং সেই সাথে কুরআন-সুন্নাহ’র অনুসরণ করার আহবান জানাই। আল্লাহ তা’আলার নিকট আশ্রয় চাইছি বিভ্রান্ত হওয়া থেকে, পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে এবং সত্য সামনে প্রকাশ্য দিবালোকের মত প্রকাশিত হওয়ার পরও যেন আমরা তা গ্রহণ করা থেকে বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করি। হে আল্লাহ, তুমি আমাদের হক বুঝার সুমতি দান কর এবং আমাদের হিদায়াতের পথে প্রতিষ্ঠিত রাখ, আমীন।
You are subscribed to email updates from QuranerAlo.com - কুরআনের আলো ইসলামিক ওয়েবসাইট
To stop receiving these emails, you may unsubscribe now.
Email delivery powered by Google
Google Inc., 20 West Kinzie, Chicago IL USA 60610
Reply

Forward


Click here to Reply or Forward
Why this ad?Ads –
World's Largest Online Community. Join for Free & Enjoy the Benefits!
512

দশ স্বর্ণমুদ্রার ক্রীতদাস

Posted: 05 Jan 2013 08:39 PM PST
সংকলনঃ কুরআনের আলো
মক্কার ধনী ব্যাক্তি উমাইয়া। ধনে-মানে সব দিক দিয়েই কুরাইশদের একজন প্রধান ব্যাক্তি সে। প্রাচুর্যের যেমন তার শেষ নেই, ইসলাম বিদ্বেষেও তার কোন জুড়ি নেই। শিশু ইসলামকে ধ্বংসের কোন চেষ্টারই সে কোন ত্রুটি করে না। এই ঘোরতর ইসলাম বৈরী উমাইয়ারই একজন ক্রীতদাস ইসলাম গ্রহন করেছে। তা জানতে পারল উমাইয়া। জানতে পেরে ক্রোধে ফেটে পড়ল সে। অকথ্য নির্যাতন সে শুরু করল। প্রহারে জর্জরিত প্রায় সংজ্ঞাহীন ক্রীতদাসকে সে নির্দেশ দেয়, “এখনও বলি, মুহাম্মাদের ধর্ম ত্যাগ কর। নতুবা তোর রক্ষা নেই।”
 কিন্তু তার ক্রীতদাস বিশ্বাসে অটল। শত নির্যাতন করেও তাঁর বিশ্বাসে বিন্দুমাত্র ফাটল ধরান গেল না। ক্রোধে উন্মাদ হয়ে পড়ল উমাইয়া। শাস্তির আরও কোঠরতর পথ অনুসরণ করল সে।
 একদিনের ঘটনা। আরব মরুভুমির মধ্যাহ্ন। আগুনের মত রৌদ্র নামছে আকাশ থেকে। মরুভুমির বালু যেন টগবগিয়ে ফুটছে। উমাইয়া তার ক্রীতদাসকে নির্দয়ভাবে প্রহার করল। তারপর তাঁকে সূর্যমুখী করে শুইয়ে দেওয়া হল। ভারী পাথর চাপিয়ে দেওয়া হল বুকে। ক্রীতদাসের মুখে কোন অনুনয় বিনয় নেই। মনে নেই কোন শঙ্কা। চোখে অশ্রু নেই, মুখে কোন আর্তনাদও নেই। ঊর্ধ্ব মুখী তাঁর প্রসন্ন মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে আল্লাহ্‌র প্রশংসা ধ্বনি- ‘আহাদ’, ‘আহাদ’।
 ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন হযরত আবু বকর (রাঃ)। ‘আহাদ’ ‘আহাদ’ শব্দ তাঁর কানে গেল। অনুসন্ধিৎসু হয়ে শব্দ লক্ষ্যে তিনি মরুভুমির বুকে শায়িত ক্রীতদাসের সমীপবর্তী হলেন। উমাইয়াকে দেখে তিনি সব ব্যাপারটাই মনে মনে বুঝে নিলেন। বললেন, “উমাইয়া, আপনাকে তো ধনী ও বিবেচক লোক বলেই জানতাম। কিন্তু আজ প্রমান পেলাম, আমার ধারণা ঠিক নয়। দাসটি যদি এতই না পসন্দ, তাকে বিক্রি করে দিলেই পারেন। এমন নির্দয় আচরণ কি মানুষের কাজ?”
 হযরত আবু বকরের (রাঃ) ঔষধে কাজ হল। উমাইয়া বললেন, “এত বাহাদুরী দেখাবেন না। দাস আমার, এর উপর সদাছার-কদাচার করার অধিকার আমারই। তা যদি এতই দয়া লেগে থাকে, তবে একে কিনে নিলেই পারেন।”
 হযরত আবু বকর (রাঃ) এই সুযোগেরই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি চট করে রাজী হয়ে গেলেন। একজন শ্বেতাঙ্গ ক্রীতদাস ও দশটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে কিনে নিলেন কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসকে। হযরত আবু বকর (রাঃ) ক্রীতদাসকে মরুভুমির বুক থেকে টেনে তুলে গা থেকে ধুলা ঝেড়ে দিলেন। উমাইয়া বিদ্রূপের হাসি হেসে বললেন, “কেমন বোকা তুমি বলতো? এই অকর্মণ্য ভৃত্যটাকে একটি স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়েই বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলাম। এখন আমার লাভ ও তোমার ক্ষতি দেখে হাসি সংবরণ করতে পারছি না।”
 আবু বকর (রাঃ)ও হেসে বললেন, “আমি ঠকিনি বন্ধু! এ ক্রীতদাসকে কেনার জন্য আমার সমস্ত সম্পত্তি দিতে হলেও আমি কুণ্ঠিত হতাম না। কিন্তু একে আমি ধারণাতীত সস্তা মুল্যে ক্রয় করে নিয়ে চললাম।”
 এই দাসটিই ছিলেন বিশ্ব বিশ্রুত বিলাল। ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হযরত বিলাল (রাঃ)।
উৎসঃ বই- আমরা সেই সে জাতি (আবুল আসাদ)
You are subscribed to email updates from QuranerAlo.com - কুরআনের আলো ইসলামিক ওয়েবসাইট
To stop receiving these emails, you may unsubscribe now.
Email delivery powered by Google
Google Inc., 20 West Kinzie, Chicago IL USA 60610

শনিবার, ৫ জানুয়ারি, ২০১৩

ইসলামের সহজসাধ্যতা ও সরলতা

Posted: 04 Jan 2013 06:54 PM PST
অনুবাদঃ আবদ্‌ আল-আহাদ | ওয়েব সম্পাদনাঃ শাবাব শাহরিয়ার খান | English Version
প্রকাশনায়ঃ কুরআনের আলো ওয়েবসাইট
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ্‌,
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের জন্য। দরূদ ও সালাম অবতীর্ণ হোক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদ (সা) এর উপর এবং তাঁর পরিবারবর্গ ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের উপর।

লেখার শুরুতেই একটি বিষয় খুব ভালভাবে পরিষ্কার করে নেয়া দরকার। আজকের প্রবন্ধটিতে ইসলাম মেনে চলা কতটা সহজ এবং বাস্তবধর্মী তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে যদিও দেখানো হয়েছে যে ইসলাম অতিসহজ ও নির্ঝঞ্ঝাট এক জীবন ব্যবস্থার নাম তথাপি এমনটি ভাবার কোন অবকাশ নেই যে ইসলাম পালনকারী একজন মুসলিমের জীবনে কোন বাধা-বিঘ্ন কিছুই থাকবে না। বরং সত্য হল তার উল্টোটি। কারণ ইসলাম পালনকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকেই আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন পরীক্ষা করবেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং, যদিও কেউ ইসলাম মেনে চলার ক্ষেত্রে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয় এবং তা মেনে চলে, তারপরও তিনি ইসলাম মেনে চলার ব্যাপারে কতটুকু বদ্ধপরিকর তা আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন পরীক্ষা করে ছাড়বেন।

অনেক মানুষের মধ্যে একটা ভুল ধারনা আছে যে ইসলাম মেনে চলা খুবই কঠিন এবং ইসলামের বিধি-নিষেধ মেনে চলা খুবই ঝামেলার কাজ। মানুষের মধ্যে এই ধরনের ভুল ধারনা থাকার সম্ভাব্য কারণ হল তারা ইসলাম সম্পর্কে মোটেই জ্ঞান রাখেনা এবং তাদের এতোটুকু বোধশক্তি নেই যে তারা বুঝবে ইসলাম মেনে চলা কতটা সহজ। ইসলামের  বুনিয়াদী শিক্ষা তথা মূলনীতিগুলো বিবেচনা করলেই বুঝা যায় ইসলাম কত সহজ একটা জীবন ব্যবস্থার নাম, এটা মেনে চলা কতটা সহজ এবং কতটা বাস্তবধর্মী।

ইসলামিক বিশেষজ্ঞদের সকলেই এ বিষয়ে একমত যে, পৃথিবীতে সমস্ত বিষয়াবলীই ইসলামে অনুমোদিত যদি না কোন কিছুকে বিশেষভাবে উল্লেখ করে নিষিদ্ধ করা হয়ে থাকে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, কোন কিছুকে নিষিদ্ধ বলতে চাইলে তার স্বপক্ষে দলীল হাজির করা লাগবে নতুবা সেটা নিষিদ্ধ হবে না। নিষিদ্ধ হওয়ার পক্ষে দলীল-প্রমান না থাকলে সেটা ইসলামে অনুমোদিত। পার্থিব সকল ক্ষেত্রেই এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে, যেমনটি হবে ধর্মীয় ক্ষেত্রে। আর সে কারনেই ইবাদতের ক্ষেত্রে কোন কিছু করার সুস্পষ্ট অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও সেটা করা হলে তা বিদ’আহ্‌ বলে গণ্য হবে। এ বিষয়ে প্রমানস্বরূপ নিম্নোক্ত আয়াত দুটো উল্লেখ করা যায়ঃ
 “...তোমাদের পক্ষে যা সহজ আল্লাহ্‌ তাই চান ও তোমাদের পক্ষে যা কষ্টকর তা তিনি চান না...”[সূরা বাকারাহ্‌; ০২:১৮৫]
“...তিনি (আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন) দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেন নাই...”[সূরা হজ্ব; ২২:৭৮]
নিম্নোক্ত হাদিসটিও উপরিউক্ত আয়াত দুটির স্বপক্ষের দলীলঃ
“দ্বীন সহজ এবং যে কেউ দ্বীনকে নিজের জন্যে কঠিন করে ফেললে সে তা আর পালন করতে পারবেনা। সুতরাং, তোমাদের উচিৎ হবে না চরম পন্থি হওয়া। বরং সাধ্যমত নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা কর এবং সুসংবাদ গ্রহণ কর যে তোমরা প্রতিদান প্রাপ্ত হবে; এবং সকালে ও রাতে ইবাদতের মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় কর।” [সহীহ্‌ আল-বুখারী; ১:২:৩৮]
এমনকি ইমাম বুখারী (রহিমাহুল্লাহ্‌) তার সহীহ্‌ আল-বুখারীতে ইসলাম কত সহজ একটি জীবন ব্যবস্থা তা তুলে ধরার জন্য “দ্বীন (ইসলাম) সহজ”নামে একটি অধ্যায় রচনা করে সেখানে তা প্রমান করে দেখিয়েছেন।
প্রথমত, ইসলাম মেনে চলা যে কঠিন কিছু নয় তার প্রমান হল, ইসলামে পার্থিব সকল কিছুই অনুমোদিত যদি না কোন কিছু আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের কিতাব এবং রাসূল (সা) এর হাদীসে অথবা সেগুলোর উপর ভিত্তি করে উপনীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নিষিদ্ধ হয়ে থাকে। আল্লাহ্‌র দুনিয়ায় অসংখ্য বিষয় আছে তার মধ্যে মাত্র হাতেগোনা কিছু বিষয় আমাদের জন্য নিষিদ্ধ। ইসলাম কোন দুনিয়া বিমুখ জীবন ব্যবস্থা নয় যা তার অনুসারীদের দুনিয়ার কাজকর্ম বাদ দিয়ে পাহাড়ের গুহায় বসে আল্লাহ্‌র ধ্যান করতে শিক্ষা দেয়। বরং ইসলাম এ ধরনের চর্চার ঘোর বিরোধী। ইসলাম মানুষকে এক স্বাভাবিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপনের পথে উৎসাহিত করে যেখানে একজন ব্যক্তি আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন নির্ধারিত সীমারেখার ভিতরে থেকে সামাজিক জীবন যাপন করবে, তার প্রতি আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের যে হক তা আদায় করে নিজের প্রতি নিজের হক ও অন্যান্য সৃষ্টিকুলের প্রতি তার হক আদায় করবে।
ইসলাম সকল সৃষ্টিকুলের অধিকার নিশ্চিত করেছে; অন্যায়ভাবে কোন মানুষ বা জীবজন্তু বা গাছপালা এমনকি নিজের ক্ষতি হয় এমন কিছু করা যাবেনা। ইসলামের শিক্ষা হল আমাদেরকে যে কোন মুল্যে সকল প্রকার অন্যায় ও অপকর্ম থেকে দূরে থাকতে হবে। এমনকি যে সব কাজকর্ম মন্দের পথে চালিত করে সেগুলো থেকেও বিরত থাকতে হবে। একজন মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের কিছু মৌলিক দায়িত্ব এবং কর্তব্য আছে সেগুলো পালন করতে হবে। যদি উক্ত কাজগুলো ঠিকঠাক সম্পন্ন করতে পারি তাহলে আমরা ইসলাম অনুমোদিত অন্যান্য বিষয়গুলো প্রাণভরে উপভোগ করতে পারব।
ইসলাম হল “দ্বীনুল ফিতর্‌” তথা প্রাকৃতিক বা স্বভাব ধর্ম; ইসলাম এমন একটি জীবন ব্যবস্থা যা মানুষের মেজাজ মর্জির সাথে একশত ভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলাম তার অনুসারীদেরকে এমন কোন কিছু করতে বলে না যা তার মানবীয় প্রকৃতির বিরুদ্ধে যাই। পুরো কুর’আন এবং রাসূল (সা) এর হাদীস খুঁজে ইসলামের এমন একটি বিধান দেখান যা মানব প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমন কোন কিছুই আপনি খুঁজে পবেন না।
ইসলাম কখনই আমাদের জন্য বোঝাস্বরূপ নয়। আর ইসলাম কখনো আমাদেরকে তা করতে বলে না যা করার ক্ষমতা মানুষ হিসেবে আমাদের নেই। ইসলাম কখনই এমন কিছু করতে বলে না যাতে করে আমাদেরকে নিজেদের ব্যক্তিত্ব, টাকা-পয়সা, সামাজিক জীবন সবকিছুকে বিলিয়ে দিতে হয়। এমনও নয় যে ইসলাম মানতে হলে আমাদেরকে দিনরাত সালাত আদায় করতে হবে আর রোজা রাখতে হবে। বরং এমনটি করা নিষিদ্ধ। আমাদের কাছে ইসলামের দাবী হল এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যেখানে আমরা আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের ইবাদত করার পাশাপাশি অন্যান্য মানুষের প্রতি আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করতে পারি আবার নিজের দিকেও খেয়াল রাখি। ইসলাম নির্ধারিত পন্থায় অন্যান্য মানুষদের প্রতি দায়িত্ব পালন করলে সেটাও ইবাদতের মধ্যেই পড়ে। আপনি ইসলামের এমন একটি বিধানও দেখাতে পারবেন না যা মেনে চলা আমাদের মানবীয় ক্ষমতার বাইরে।
মানুষের কাছে ইসলাম মেনে চলা এতো কঠিন মনে হওয়ার একটি কারণ হল শয়তান তাদের কাছে খারাপ এবং মন্দ কাজগুলোকে অত্যন্ত মহনীয় করে উপস্থাপন করে এবং সৎকর্মগুলোকে কঠিন ও বিরক্তিকর করে উপস্থাপন করে। ফলে তারা সৎকর্ম সম্পাদনের ব্যাপারে অনীহা ও অনাগ্রহ বোধ করে। এতোদসত্ত্বেও কেউ যদি শয়তানি ওয়াস-ওয়াসাকে জয় করে ইসলাম পালনের ব্যাপারে সচেষ্ট হয় তাহলে ইসলাম যে সমস্ত কাজগুলোকে ভাল বলে সেগুলো করা তার জন্য কোন কঠিন কিছু মনে হবে না এবং কাজগুলো করে সে মনের ভেতর এক অকৃত্রিম সুখ অনুভব করবে। ফলে মন্দ আর পাপের কাজগুলো তার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে। আপনি নিজেই একবার পরখ করে দেখুন ভাল কাজ করে মনে কি সুখ অনুভুত হয়।
ইসলাম তার অনুসারীদের যা শিক্ষা দেয় তা হল একমাত্র আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের ইবাদত করা অর্থাৎ তাঁর সাথে ইবাদতের ক্ষেত্রে কাউকে শরীক না করা, দিনে রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা, বছরে মাত্র একটি মাস সাওম বা রোজা রাখা, বছরান্তে একবার উদ্বৃত্ত সম্পদের শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত হিসেবে দান করা, সম্ভব হলে জীবনে একবার হজ্ব করা এবং সাধারণভাবে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের সমস্ত সৃষ্টিকুলের প্রতি সদ্য় আচরণ করা, নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকা এবং সৎ চরিত্র বজায় রেখে জীবন যাপন করা। উল্লেখিত বিষয়গুলোর কোন একটিও মেনে চলার জন্য একজন মানুষের সমর্থের বাইরে নয় বা অসম্ভব কিছু নয়। এমন একটি বস্তুও ইসলাম আমাদের জন্য নিষিদ্ধ করেনি যা আমাদের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়। বরং লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে ইসলামে যা কিছু নিষিদ্ধ তার প্রত্যেকটিই আমাদের জন্য ক্ষতিকর।
আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা মনে রাখতে হবে তা হল আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন হলেন “রহমান”এবং “গফুর”। অর্থাৎ, তিনি হলেন পরম করুণাময় এবং পরম ক্ষমাশীল। আমরা ইসলাম মেনে চলার ক্ষেত্রে আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করা সত্ত্বেও যদি কোন প্রকার মানবিক ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েই যায় তাহলে আমাদের জন্য তাঁর তওবার দরজা সর্বদায় উন্মুক্ত।
ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো উপলব্ধি করা খুবই সহজ এবং মেনে চলার ক্ষেত্রে চরম বাস্তবধর্মী। ইসলামের সারল্য মাধুর্য এবং বাস্তবধর্মীতা এই জীবন ব্যবস্থাকে দিয়েছে একটি বিশ্বজনীন জীবন ব্যবস্থার সুমহান মর্যাদা যা শারীরিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা নির্বিশেষে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ মেনে চলতে সক্ষম। ইসলামের এই মাধুর্যময় সারল্য এবং বিশ্বজনীন আবেদনের কারনেই সারা পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা আজ দলে দলে ইসলামের সুশীতল ছায়া তলে আশ্রয় গ্রহণ করছে।
আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন আমাদের সকলকে সঠিকভাবে ইসলামকে উপলব্ধি করার ও মেনে চলার তৌফিক দান করুন। আমীন।


You are subscribed to email updates from QuranerAlo.com - কুরআনের আলো ইসলামিক ওয়েবসাইট
To stop receiving these emails, you may unsubscribe now.
Email delivery powered by Google
Google Inc., 20 West Kinzie, Chicago IL USA 60610
Reply

Forward


Click here to Reply or Forward
Why this ad?Ads –
Find Friends, Family & Apps. Sign Up for Facebook - It's Free!
512
0% full
Using 0.1 GB of your 10.1 GB
©2013 Google - Terms & Privacy
Last account activity: 22 hours ago
Detai

শুক্রবার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৩

সামাজিক অবক্ষয়ের মূল্য না চুকিয়ে উপায় নেই

Posted: 03 Jan 2013 08:00 PM PST
লিখেছেনঃ মাহমুদুর রহমান | মূল প্রবন্ধ 
A night Club in Dhaka City. May Allah protect Muslims from all these unislamic activities. A night Club in Dhaka City. May Allah protect Muslims from all these unislamic activities.
দরিদ্র পরিবারের যে মেধাবী তরুণীটির মৃত্যুর ঘটনায় সারা বিশ্বে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, সে অর্থনৈতিক দৈন্যের মধ্যেও লেখাপড়া করে একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল। মানুষরূপী শ্বাপদের দল সেই স্বপ্নের কী অপমৃত্যুই না ঘটিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন তার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেছেন, Every girl and woman has the right to be respected, valued and protected (সকল কন্যা এবং নারীর অধিকারকে সম্মান ও মূল্য দিতে হবে, তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে). তিনি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে বলিউডের সুপারস্টার শাহরুখ খান তার টুইটারে মন্তব্য করেছেন, আমি এই অসুস্থ সমাজ এবং সংস্কৃতির একজন হওয়ার জন্য লজ্জাবোধ করছি। এক কথায় ভারতীয় মাত্রই এখন এক প্রকার আত্মোপলব্ধির (Soul- searching) প্রয়াসে রত হয়েছে। অবশ্য একবিংশ শতাব্দীর ধর্মহীন, জড়বাদী (materialistic) সমাজে এই ইস্যুও খুব বেশিদিন গণমাধ্যমে আলোচিত হবে, এমন প্রত্যাশা না থাকাই শ্রেয়। এসব ঘটনা সমাজ দেহে পচনের লক্ষণ মাত্র। এই পচনের পেছনে অপসংস্কৃতি এক বিরাট ভূমিকা রাখছে। বলিউডের কাজ-কারবারের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করা যাক।
বলিউডের সিনেমায় কিছুদিন ধরে আইটেম সং (Item song) নামক এক প্রকার অশ্লীল নৃত্যগীতের প্রচলন ঘটেছে, যা পিতা-মাতা কিংবা পুত্র-কন্যা নিয়ে দেখা কোনো ভদ্র পরিবারে সম্ভব নয়। হিন্দি সিনেমার অশ্লীলতা নোংরা পর্নো ছবিকে পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। যে শাহরুখ খান ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির অবক্ষয় নিয়ে টুইটারে হা-হুতাশ করছেন, এতদিন তার কাছ থেকে বলিউডি ছবির নোংরামি নিয়ে কোনো প্রতিবাদ শোনা যায়নি। বছর দুয়েক আগে তিনি এবং হিন্দি ছবির আরও কয়েকজন নায়ক-নায়িকা বাংলাদেশে স্টেজ শো করতে এসেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে তরুণীরা যেভাবে স্বল্প বসনা হয়ে উত্তেজক নৃত্য পরিবেশন করেছিল, সেটি আমাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সমাজ চেতনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। দিনে চব্বিশ ঘণ্টাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফেরি করা সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে এসবের কোনো প্রতিবাদ শোনা যায়নি।
সিনেমার কথা বাদ দিয়ে ভারতীয় বিজ্ঞাপনের বিষয়ে ভাবুন। নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করারও বোধহয় একটা সীমা থাকা দরকার। বোতলজাত আমের রস নিয়ে এক বিজ্ঞাপনচিত্রে বলিউডের শীর্ষ নায়িকা ক্যাটরিনা কাইফ অভিনয় করেছেন। বিজ্ঞাপনটির প্রতিটি ফ্রেমে অর্ধ বিবসনা নায়িকার শরীরী ভঙ্গি এবং মুখের অভিব্যক্তিতে বাত্স্যায়নের কামসূত্রের প্রতিফলন রয়েছে।
পুরুষদের ব্যবহার্য ডিওড্যারান্ট (Deodorant)-এর বেশ ক’টি বিজ্ঞাপনে নারীদের কুিসতভাবে কামতাড়িত দেখানো হয়েছে। এ জাতীয় একটি বিজ্ঞাপনে পিতার বয়সী এক লোক সেই ডিওড্যারান্ট শরীরে মাখার পর তার পরনের পোশাক কন্যাসমা এক তরুণীর ঝাঁপিয়ে খুলে দেয়ার দৃশ্য দেখলে বিজ্ঞাপন চিত্রটির নির্মাতাকে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত মনে হওয়া উচিত। বিজ্ঞাপনটি দেখে আমার অন্তত বমনেচ্ছা হয়েছে। মোট কথা, ভারতের শো-বিজে অসভ্যতার সকল সীমা লঙ্ঘন করা হয়েছে। সুতরাং, দিল্লির বাসে ধর্ষিত হয়ে নিহত তরুণীর মৃত্যুর দায় থেকে সংস্কৃতির নামে সমাজে অশ্লীলতা আনয়নকারীরাও মুক্তি পেতে পারে না।
আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনের এই যুগে বাংলাদেশের সামাজিক মূল্যবোধও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মিডিয়া দ্বারা ক্রমাগত আক্রান্ত হয়ে চলেছে। বাংলাদেশের কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের ভারতে প্রবেশাধিকার না থাকলেও ভারতের সবগুলো চ্যানেলের অনুষ্ঠান আমাদের অন্তঃপুরে বিনা বাধায় প্রবেশ করেছে। সুতরাং, এতক্ষণ ওখানকার যেসব অশ্লীল ছায়াছবি এবং বিজ্ঞাপনচিত্র নিয়ে আলোচনা করলাম, তার অনিষ্টকর প্রভাব থেকে আমাদের তরুণ সমাজও মুক্ত থাকতে পারছে না। এছাড়া ইন্টারনেট এবং সামাজিক নেটওয়ার্কজনিত সমস্যা দেশের অধিকাংশ কিশোর-কিশোরীর পিতা-মাতাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
তদুপরি বর্তমান সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে প্রবল প্রচারণা চলছে। ক’দিন আগে এ দেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশন লেখক ও সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাফর ইকবালের একটি কলাম পড়লাম। প্রথম আলোয় প্রকাশিত ‘তোমরা যারা শিবির করো’ শিরোনামের কলামটিতে তিনি শিবিরের কর্মীদের মগজ ধোলাইয়ের চেষ্টা করেছেন। সেই লেখার একটি অংশ আমার আজকের মন্তব্য প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করে উদ্ধৃত করছি। জাফর ইকবাল শিবির কর্মীদের উদ্দেশ্য করে সখেদে লিখেছেন, ‘যে বয়সে ছেলে আর মেয়ের ভেতর সহজ ভালো লাগা ভালোবাসা জন্ম নেয়ার কথা, সেই বয়সে তারা সেই অনুভূতিগুলোকে অশ্রদ্ধা করতে শেখে।’ একজন অধ্যাপকের তার ছাত্রছাত্রীদের পরস্পরকে ভালোবাসায় উত্সাহিত করার এই প্রাণান্তকর চেষ্টায় আমি বিস্মিত হয়েছি। শিবির করা ছেলেদের ব্রহ্মচর্য পালন করতে হয় এমন তথ্য জাফর ইকবাল কোথা থেকে পেয়েছেন, সেটা তিনিই ভালো জানেন।
ব্রিটিশ ভারতে ১৯০৫ সালের পর বঙ্গভঙ্গ রোধের জন্য বাঙালি হিন্দু তরুণদের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী সন্ত্রাসী আন্দোলন গড়ে ওঠার সময় তাদের ভাষায় দেশমাতৃকাকে শৃঙ্খলমুক্ত করার সংগ্রামে আত্মবলিদানে ইচ্ছুকদের চিরকুমার থাকার একটা প্রথার কথা ইতিহাসের বিভিন্ন বইতে পড়েছি। চট্টগ্রাম বিদ্রোহের নায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনও চিরকুমার ছিলেন। সেইসব বিপ্লবীর জীবন নিয়েই শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘পথের দাবী’ নামক উপন্যাস লিখেছিলেন। সেই উপন্যাসের নায়ক সব্যসাচীও বিয়ে করেননি। তবে একটি প্লেটোনিক প্রেমের ইঙ্গিত বোধহয় কাহিনীতে ছিল। কিন্তু, ইসলামে এ জাতীয় বৈরাগ্যের কোনো দর্শন নেই। সুতরাং শিবির কর্মীদের প্রেম করায় দল থেকে বাধা দেয়ার কোনো আদর্শিক কারণ আছে বলে মনে হয় না।
সূরা হাদীদ-এর ২৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘আর বৈরাগ্যবাদ তো তাদেরই আবিষ্কৃত, আমি তো তাদের এ বিধান দেইনি।’ হাদিস শরীফেও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ইসলামে বৈরাগ্যবাদ নেই। তারপরও শিবিরের ছেলেদের জীবনে কথিত প্রেমহীনতার জন্য অধ্যাপক মহোদয়ের হা-হুতাশ কি প্রগতিশীলতার নামে সমাজে উচ্ছৃঙ্খলতাকে উস্কে দেয়ার প্রয়াস? ছাত্রজীবনে আমার প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, উভয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করার সৌভাগ্য হয়েছিল। বুয়েটে পাঠদানকালে রাশভারি শিক্ষকরা সর্বদা পড়াশোনায় মনোযোগী হতে বলতেন, কখনও প্রেম নিয়ে কথা বলেছেন এমন স্মৃতি স্মরণে আসছে না। অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বুড়ো বয়সে পড়েছি। সেখানে তরুণ বয়সে পড়লে হয়তো জাফর ইকবালের মতো কোনো প্রগতিশীল শিক্ষকের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য হতো। এই অধ্যাপকের মতো যারা বাংলাদেশের সমাজ জীবন থেকে ইসলাম বর্জন করে জনগণের চিন্তা-চেতনাকে ভারতমুখী করতে চান, তাদের জন্য দিল্লির মর্মান্তিক ঘটনা হয়তো শিক্ষণীয় হতে পারে।
বাংলাদেশের নারীরাও ধর্ষকামী পুরুষদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় টাঙ্গাইলের এক ১৫ বছরের কিশোরীর গণধর্ষণের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। অসহায় স্কুল ছাত্রীটি ২১ দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়লেও আমাদের নারী নেত্রীদের ঘুম ভাঙেনি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রলীগের নেতার ধর্ষণে সেঞ্চুরির সংবাদ দেশের প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রে এক সময় ছাপা হয়েছিল। ধারণা করছি, অধ্যাপক জাফর ইকবালের কাছে ইসলাম ধর্ম চর্চায় অভ্যস্ত শিবিরের ছেলেদের তুলনায় ছাত্রলীগের সেই ধর্ষক অনেক বেশি আদরণীয়।
গত চার বছরে বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে প্রচারণা লক্ষণীয়ভাবে তীব্র হয়েছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে ইসলামকে জড়িত করার একটা অপচেষ্টা এ দেশে দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। আমাদের অধিকাংশ নাটকেই দাড়ি-টুপিওলাদের নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করা হয়ে থাকে। ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলের সোপ অপেরাগুলোতে পূজা-অর্চনা অত্যন্ত মহিমান্বিত করেই দেখানো হয়। আমাদের নাট্য জগতের প্রগতিশীলরা সেখানে ধর্মান্ধতা খুঁজে না পেলেও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ইসলাম ধর্মের প্রবেশাধিকার প্রায় নিষিদ্ধ করে রেখেছেন। শহীদ মিনারে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানোতে কিংবা প্রবারণা পূর্ণিমার অনুষ্ঠান আয়োজনে এ দেশের সুশীলরা (?) সোত্সাহে অংশগ্রহণ করলেও সেখানে কোনো মুসলিম মনীষীর জানাজা অনুষ্ঠানে তাদের বিষম আপত্তি। আপন ধর্মের প্রতি এমন বিরাগের উদাহরণ বিশ্বের অন্য কোনো দেশে আমি অনেক দেশ ভ্রমণ করেও দেখতে পাইনি।
এই বিশেষ শ্রেণীটির কাছে তীব্র জাতবৈষম্যের হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস নাকি উদার, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা শান্তিপ্রিয়, এবং খ্রিস্টধর্ম আধুনিক রূপে বিবেচিত হলেও ইসলাম নিয়ে তাদের সমালোচনার অন্ত নেই। আলখাল্লা পরিহিত খ্রিস্টান পাদ্রিরা এদের ভাষায় সৌম্যদর্শন হলেও, পায়জামা-পাঞ্জাবি গায়ে, টুপি পরা মসজিদের ইমাম একজন ইসলামী জঙ্গির অধিক মর্যাদা পান না। অথচ, সময়ের বিচারে ইসলাম ধর্মই সর্বশেষে এসেছে। এ দেশের নারীবাদীদের অধিকাংশই হয়তো এটাও জানেন না যে প্রথম মুসলমান এবং ইসলামের প্রথম শহীদ উভয়ই মহিলা। সমাজ থেকে হারিয়ে যাওয়া নীতিবোধ ফিরিয়ে আনার জন্য সকল ধর্ম মতের প্রতিই আমাদের শ্রদ্ধা থাকা আবশ্যক। ধর্ম মানুষকে পরিচিতি দেয়ার পাশাপাশি সমাজ জীবনেও শৃঙ্খলা আনয়ন করে। ইসলামের আবির্ভাব আইয়ামে জাহেলিয়াতের আরবভূমিকে সামাজিক শৃঙ্খলা ও ন্যায় বিচারের মানদণ্ডে বিশ্বে সর্বশ্রেষ্ঠ ভূখণ্ডে পরিণত করেছিল। নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং সর্বপ্রকার অশ্লীলতা পরিহার করে মানব চরিত্রের রিপুকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআন শরীফ একইভাবে ১৫০০ বছর আগে সমগ্র মানবজাতির জন্য কল্যাণকর বিধান রূপে আবির্ভূত হয়েছিল। সূরা নূর-এর ৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্তায়ালা নির্দেশ দিচ্ছেন, ‘যাদের বিবাহের সামর্থ্য নেই তারা যেন সংযম অবলম্বন করে।’
প্রগতিশীলতার আবরণে যারা ধর্মীয় বিধানের বিরুদ্ধাচারণ করছেন, তাদেরই আজ সকল প্রকার সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দায় গ্রহণ করতে হবে। এ দেশের অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেলের বিভিন্ন অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ইসলাম বিরোধীদের আধিক্য লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অবস্থার এতটাই অবনতি ঘটেছে যে, কোনো ধর্মপ্রাণ অতিথি সেসব অনুষ্ঠানে ইসলামের পক্ষে মন্তব্য করতে গিয়ে রূঢ় আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। কিছুদিন আগে এক টক শোতে বাংলাদেশে সামাজিক অবক্ষয় প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে সাবেক সচিব, মো. আসাফদ্দৌলাহ সুশাসনের উদাহরণ হিসেবে হজরত ওমর (রা.)-এর শাসন কালের উল্লেখ মাত্র সেই টক শোর তরুণ উপস্থাপক তাকে অত্যন্ত অভদ্রভাবে থামিয়ে দেন। স্পষ্ট ভাষণের জন্য বিশেষ পরিচিত, প্রবীণ একজন ব্যক্তির সঙ্গে সেই আচরণ দেখে আমার মনে হয়েছিল এ দেশের গণমাধ্যমে ইসলাম প্রসঙ্গে আলোচনা করাটা কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এই পরিবেশে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ উজ্জীবিত করাও পিতা-মাতার জন্য ক্রমেই দুরূহ হয়ে উঠছে।
ক’দিন আগে ইসলাম চর্চার অপরাধে মগবাজারের এক বাসা থেকে ২০ তরুণীকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। একজন অন্তঃসত্ত্বা তরুণীকে নির্যাতনও করা হয়েছে। মহিলা পরিষদসহ বাংলাদেশের কোনো মানবাধিকার অথবা নারীবাদী সংগঠন এ বিষয়ে নিন্দাসূচক একটি বাক্যও অদ্যাবধি উচ্চারণ করেনি। আমি নিশ্চিত যে, গুলশান-বারিধারার কোনো ক্লাব থেকে নৃত্যরত তরুণীদের ৩১ ডিসেম্বর রাতে এভাবে গ্রেফতার করা হলে চারদিক থেকে প্রতিবাদের ঝড় উঠে যেত। ভারতের রাজধানীর এই কলঙ্কজনক ঘটনা আমাদের সমাজপতিদের জন্য শিক্ষণীয় হওয়া উচিত। সরকার এবং বিরোধী দল নির্বিশেষে জাতীয় নেতৃবৃন্দের সুস্থ জাতি গঠনে অপসংস্কৃতির অবাধ আগ্রাসনের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে এখনই সতর্ক হওয়া কর্তব্য। কিছু বিদেশি আপত্তিজনক চ্যানেল এবং বিজ্ঞাপন প্রদর্শন এ দেশে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়নসাপেক্ষে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে দলমত নির্বিশেষে আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের সর্বনাশ অনিবার্য হয়ে উঠবে। মানব কল্যাণ অথবা বিপর্যয় সৃষ্টি উভয় ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের কার্যকর ভূমিকা রয়েছে। পারমাণবিক চুল্লি থেকে যেমন স্বল্প খরচে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা সম্ভব, একইভাবে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র তৈরিতেও একই চুল্লির প্রয়োজন হয়। বিজ্ঞানকে ব্যবহার করেই আমাদেরও বিজ্ঞানের অশুভ প্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত থাকার প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের সন্তানদের উচ্চ মূল্যবোধ সম্পন্ন আদর্শ নাগরিক রূপে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে আসুন, আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। সন্তানদের মঙ্গল চিন্তা অন্তত আমাদের সঙ্কীর্ণ দলীয় ভাবধারা মুক্ত হয়ে করতে হবে।
admahmudrahman@gmail.com
You are subscribed to email updates from QuranerAlo.com - কুরআনের আলো ইসলামিক ওয়েবসাইট
To stop receiving these emails, you may unsubscribe now.
Email delivery powered by Google
Google Inc., 20 West Kinzie, Chicago IL USA 60610





Click here to Reply or Forward
Why this ad?Ads –
World's Largest Online Community. Join for Free & Enjoy the Benefits!
0% full
Using 0.1 GB of your 10.1 GB
©2012 Google - Terms & Privacy
Last account activity: 29 minutes ago
Details

রবিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১২

আমাদের কর্তব্য

নববর্ষ : আত্মপর্যালোচনার দারুণ উপলক্ষ


প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

লেখকঃ আলী হাসান তৈয়ব
সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া | প্রকাশনায় : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ
আবার এলো নববর্ষ। আবারো নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে অপচয় করা হবে কোটি কোটি ডলার। আতশবাজি, উদ্দাম নৃত্য, গান পরিবেশন, যুবক-যুবতীদের প্রণয় বিনিময়, একান্তে সময় কাটানো, বন্ধু বান্ধবীদের উদ্দেশে মোবাইল, মেইল বা সামাজিক যোগাযোগের সাইটের মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময়, মদ্য পান ও নারী নিয়ে ফূর্তি করাসহ রকমারি আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিদায় দেয়া হবে ২০১২ সালকে। বরণ করা হবে ২০১৩ সাল। দেশের ফাইভ স্টার হোটেলগুলো ও পর্যটন স্পটগুলোয়  আয়োজন করা হবে নানা অনুষ্ঠানের। মোবাইল কোম্পানিগুলোর হাওয়া থেকে উপার্জিত অর্থের সৌজন্যে কক্সবাজারে আয়োজন করা হবে চোখ ধাঁধানো বর্ষবরণ উৎসবের। Happy new year 2013 লেখায় রাস্তা ও দেয়ালগুলো সুশোভিত হয়ে উঠবে। নতুন বর্ষকে বরণের উৎসব করতে গিয়ে আরো কত কিছুই না করা হবে!
আচ্ছা, আমরা কি ভেবে দেখেছি একটি বছরের বিদায় শুধু আনন্দের বিষয়? কেবলই ফূর্তি ও উল্লাস প্রকাশের উপলক্ষ? নাহ, এ কেবল আনন্দের বিষয় হতে পারে না। বরং এটি আমাদের চিন্তা-ভাবনা ও পর্যালোচনার মোক্ষম উপলক্ষ বৈ কি। কেন? কারণ, একটি বছরের সাথে সাথে আমাদের জীবন নামক প্রাসাদ থেকে ৩৬৫ দিনের ৩৬৫টি পাথর খসে পড়ে। ছোট হয়ে আসে আমাদের নাতিদীর্ঘ জীবন। আমরা বিগত বছরটি কিভাবে কাটিয়েছি, আগামী বছর কিভাবে কাটাবো এবং এ বছর আমার অর্জন কী কী? ইত্যকার আরো নানা প্রশ্ন ঘিরে ধরা উচিত আমাদের চেতনা জগতকে।
এখন আমাদের আনন্দ-উল্লাসের এতটুকু ফুরসত থাকার কথা নয়। এখন শুধু হিসাব-নিকাশ মেলাবার সময়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় খলীফা উমর ইবন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
حاسبوا أنفسكم قبل أن تحاسبوا، وزنوا أعمالكم قبل أن توزنوا، وتزينوا للعرض الأكبر، يوم لا تخفى عليكم خافية
‘তোমাদের কাছে হিসাব চাওয়ার আগে নিজেরাই নিজেদের হিসাব সম্পন্ন করে নাও, তোমাদের আমল ওজন করার আগে নিজেরাই নিজেদের আমলসমূহ ওজন করে নাও, কিয়ামত দিবসে পেশ হওয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত কর। সুসজ্জিত হও সেদিনের জন্য, যেদিন তোমাদের সামনে কোনো কিছু অস্পষ্ট থাকবে না।’
আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে ভেবে দেখা দরকার, আমরা কী করছি? এর পরিমাণ কী? হাসান বছরী রহিমাহুল্লাহ বলেন,
رحم الله عبداً وقف عند همه، فإن كان لله مضى، وإن كان لغيره تأخر
‘আল্লাহ ওই বান্দার ওপর রহম করেন, যে তার পদক্ষেপে থামে। (এবং চিন্তা করে) যদি তা আল্লাহর জন্য হয় তা সম্পন্ন করে আর যদি তা হয় অন্য কারও জন্য তবে তা বিলম্বিত করে।’
আমরা তো কিঞ্চিৎ নেক আমল করেই তৃপ্তির ঢেকুর তুলি। ইবন আবী মুলাইকাহ্ রহ. বলেন,
أدركت ثلاثين من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم كلهم يخاف النفاق على نفسه، ما منهم أحد يقول إنه على إيمان جبريل وميكائيل
‘আমি ত্রিশজন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীকে পেয়েছি, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের নিফাক সম্পর্কে সন্ত্রস্ত ছিলেন। তাঁদের কেউ এমন ছিলেন না, যিনি বলতেন যে তিনি জিবরীল এবং মিকাঈলের মতো ঈমানের ওপর আছেন।’
বিশ্বের অন্যতম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম নাগরিকের দেশ বাংলাদেশে টিএসসিসহ উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক স্পটগুলোতে থার্টি ফার্স্ট নাইটে নববর্ষ উদযাপরনের নামে যেভাবে বেহায়া ও বেলেল্লাপনা, অবাধ যৌনাচার ও অপ্রীতিকর ঘটনার অবতারণা হয়, তা একেবারেই অনভিপ্রেত। বাধ্য হয়ে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কড়া নিরাপত্তা গ্রহণ করতে হয়। ২০০০ সালে থার্টি ফার্স্ট নাইটে বাঁধন নামের একটি মেয়ে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত ও অপমানিত হয়েছিল। যা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে আহত ও অপমানিত করেছিল।
দু বছর আগে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে থার্টি ফার্স্ট নাইট পালন করতে গিয়ে কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছিলেন। এর বছর তিনেক আগে ব্যাংককের একটি নাইটক্লাবে থার্টি ফার্স্ট নাইটে প্রাণ দিতে হয়েছে কমপক্ষে ৬০ জনকে। আহত হয়েছে আরো অনেকে। থাইল্যান্ডের ওই ক্লাবে তারা যখন আনন্দে আত্মহারা ঠিক তখনই বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের মাধ্যমে আগুনের লেলিহান শিখা তাদের বেষ্টন করে নেয়। নিমিষেই সমাপ্তি ঘটে সকল আনন্দ-উল্লাসের। এরপরও কি কেউ শিক্ষা গ্রহণ করেছে? তওবা করে ফিরে এসেছে চির শান্তির পথে? অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন,
 وَلَنُذِيقَنَّهُم مِّنَ ٱلۡعَذَابِ ٱلۡأَدۡنَىٰ دُونَ ٱلۡعَذَابِ ٱلۡأَكۡبَرِ لَعَلَّهُمۡ يَرۡجِعُونَ ٢١  [السجدة : ٢١] 
‘আর অবশ্যই আমি তাদেরকে গুরুতর আজাবের পূর্বে লঘু আজাব আস্বাদন করাব, যাতে তারা ফিরে আসে। {আলিফ-লাম-মীম আস-সাজদাহ, আয়াত : ২১}
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন,
 يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَلۡتَنظُرۡ نَفۡسٞ مَّا قَدَّمَتۡ لِغَدٖۖ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرُۢ بِمَا تَعۡمَلُونَ ١٨ وَلَا تَكُونُواْ كَٱلَّذِينَ نَسُواْ ٱللَّهَ فَأَنسَىٰهُمۡ أَنفُسَهُمۡۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ ١٩  [الحشر: ١٨،  ١٩] 
‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আর প্রত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা সে আগামীকালের জন্য কি প্রেরণ করেছে; তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত। তোমরা তাদের মত হইও না, যারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল ফলে আল্লাহও তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছিলেন; আর তারাই হল ফাসিক।’ {সূরা আল-হাশর, আয়াত : ১৮, ১৯}
আমরা সব অভিভাবকই চাই আমাদের কোমলমতি সন্তানদের জীবন হোক নিরোগ, নিটোল ও অনাবিল সুন্দর। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি নববর্ষের মতো এরূপ নানা উপলক্ষে যখন নিজেদের শাসনের বাঁধন একটু শিথিল করি, একটু সুযোগ দেই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাবার তখনই তাদেরকে বন্ধু-সতীর্থরা নিয়ে যায় লক্ষ্যহীন সাময়িক সুখের জীবনে। মাদক ও নেশার ভুবনে। যে ভুবন একটি শান্ত পুষ্পিত জীবনকে করে অশান্ত পূঁতি-গন্ধময়। যে জগত একজন ভদ্র সুবোধ সন্তানকে বানায় মা-বাবা’র অবাধ্য ও অপ্রিয়।
ইদানীং প্রতি বছরই দেখা যাচ্ছে থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন করতে তরুণ-তরুণীরা অধিক সংখ্যায় রাস্তায় বেরুবার সুযোগ পাচ্ছে। ভাবতে অবাক লাগে নিজেদের কলিজার টুকরো মেয়েটিকে পর্যন্ত আমরা মধ্য রাতে পথে-হোটেলে যাবার সুযোগ দেই? এই যে শত শত তরুণী দুপুর রাতে রাস্তায় বেরিয়ে আসছেন, এরা সবাই কি অভিভাবকহীন? নাকি এদের অভিভাবকরা সন্তানদের বল্গাহীন জীবনকে সাদরে মেনে নিয়েছেন?
মনে রাখা উচিৎ আমাদের একটু অসর্তকতার জন্য যদি সন্তানরা বিপথগামী হবার সুযোগ পায়। তবে এর ক্ষতির প্রথম শিকার হতে হবে আমাকেই। সমাজে মাথা নিচু হবে আমারই। আপন ঔরসজাত সন্তানের জন্য মানুষের কটু-কাটব্যও হজম করতে হবে কেবল আমাকে। তাছাড়া মরণের পরেও এর জন্য ক্ষতি পোহাতে হবে। আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
«كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ. الإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ, وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِي أَهْلِهِ وَهْوَ مَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ, وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَمَسْؤُولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا وَالْخَادِمُ رَاعٍ فِي مَالِ سَيِّدِهِ وَمَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَمَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ»
‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল আর সবাই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে। ইমাম একজন দায়িত্বশীল; তিনি তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। পুরুষ দায়িত্বশীল তার পরিবারের; সে জিজ্ঞাসিত হবে তার দায়িত্ব সম্পর্কে। মহিলা দায়িত্বশীল তার স্বামীর গৃহের; সে জিজ্ঞাসিত হবে তার দায়িত্ব সম্পর্কে। ভৃত্যও একজন দায়িত্বশীল, সে জিজ্ঞাসিত হবে তার মুনিবের সম্পদ সম্পর্কে।  (এককথায়) তোমরা সবাই দায়িত্বশীল আর সবাই জিজ্ঞাসিত হবে সে দায়িত্ব সম্পর্কে।’ [বুখারী : ৮৪৪, জুমআ আধ্যায়]
অতএব আমাদের যুবসম্প্রদায়কে যেমন সংযত হতে হবে, তেমনি অভিভাবকদেরও একটু সজাগ হতে হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।


*রিপোর্ট করুন

প্রতিদিন ফ্রী আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'। প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

Tagged as: , , , , , , ,

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমুহ